The Future Press
ব্রেকিং নিউজ
লোড হচ্ছে...
আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

সকাল সোয়া ৯টা। ১৮ জুলাই, ২০২৪। কমপ্লিট শাটডাউন চলছে। ফেসবুক খুলতেই দেখি শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল পুলিশ। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে ছুটে মেয়ের রুমে ঢুকে দেখি, ফাঁকা। পেছন থেকে ছোট মেয়ে বলল, প্যানিক করো না। আপি ম্যাচ, নিউজ পেপার, পেস্ট, এন্টিকাটার আর মরিচ গোলানো পানি নিয়ে ব্র্যাকে গেছে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পুলিশ গুলি ছুড়ছে। একদিন আগে আবু সাঈদ-ওয়াসিমসহ ছয়জন মারা গেছে। আর এরা এন্টিকাটার আর মরিচের গুঁড়া নিয়ে সাহস দেখাচ্ছে!

আগের রাত থেকেই পাবলিক ইউনির্ভাসিটিগুলোর হলে আর শিক্ষার্থীদের থাকতে দিচ্ছে না প্রশাসন। পুলিশ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবে রাজু ভাস্কর্য বা টিএসসি—কোথাও জড়ো হতে পারছে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

প্রায় অবরুদ্ধ পুরো শহর। দমবন্ধ এই পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই রাস্তায় নেমে আসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাজার হাজার। ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্দান, নর্থ সাউথের তরুণ-তরুণীরা আন্দোলনে নতুন করে আগুন ধরায় সেদিন, যা ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

আগে থেকেই মেসেজিং অ্যাপ ডিসকোর্ডে গ্রুপ খোলে তারা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে শেয়ার হতে থাকে গ্রুপের লিংক। চেষ্টা ছিল ১৮ তারিখে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মাঠে নামানোর।

আমার আগের রাত কেটেছে মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। কেন সে রোজ আন্দোলনে যোগ দিতে যাচ্ছে? সে পড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। বিসিএস কখনো দেবে না। কোটার তার প্রয়োজন নেই। দেশে থাকবে কি না তারও ঠিক নেই। ঘরকুনো, নিজের মধ্যে থাকা একটি মেয়ে কেন যাবে? প্রশ্নের চেয়েও জবাবগুলো ছিল অনেক তীক্ষ্ণ, ফেলো স্টুডেন্টরা গুলি খাবে, মরবে আর সে কাওয়ার্ডের মতো ঘরে বসে থাকবে? সব শেষে বলল, ‘একাত্তরে তোমার মতো মা থাকলে এ দেশ আর স্বাধীন হতো না।’

সকাল ৭টায় কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে গেছে।

ওদের পরিকল্পনা কোনোভাবে লিক হয়ে গিয়েছিল। ১৮ জুলাই ভার্সিটির গেটে আগেই পুলিশ এসে অবস্থান নেয়। পুলিশকে সামনে রেখে রাস্তায় বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ওদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল, আইডি কার্ড নেই এমন কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া যাবে না। অচেনা অনুপ্রবেশকারীদের বিক্ষোভে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।

অল্প সময়ের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। ধাওয়া দিয়ে তুলে দেয় শিক্ষার্থীদের। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এক পর্যায়ে ব্র্যাকের গেট খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ বাইরে থেকে টিয়ার শেল ক্যাম্পাসে ছুড়তে থাকে। কোণঠাসা হয়ে পড়ে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা।

এ সময় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ব্র্যাকের দিকে ছুটে আসে। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে এগোতে থাকে নর্থ সাউথসহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা। রোকেয়া সরণির পুরো রাস্তা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

মেয়ের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হয় বেলা সাড়ে ১১টায়। ফোন করে জানায়, ক্যাম্পাসে আছে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ওরা কেউ শ্বাস নিতে পারছে না। মুখ ও হাতে পেস্ট মেখেছে। খবরের কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া বানানোর পরও ঝাঁজ যাচ্ছে না।

আমি তখন যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় একটি অনলাইন পোর্টালে কাজ করি। সিদ্ধান্ত নিলাম অফিসে যাব, ওখান থেকে হেঁটে ব্র্যাকে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব। ভেঙে ভেঙে অফিসে পৌঁছালাম। কিছুটা অফিসের গাড়িতে, কিছুটা রিকশায় আর বাকিটা হেঁটে। স্টুডেন্টদের বাধা, পুলিশ-ছাত্রলীগের ব্যারিকেড পার হয়ে ব্র্যাক পর্যন্ত আর এগোনো গেল না।

সারা দেশ থেকে ভয়াবহ নৃশংসতার খবর আসতে থাকে। দেশের ৪৭ জেলায় পুলিশ-র‌্যাব, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় ৩১ জন নিহত হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ২৬ জন। শুধু ঢাকায়ই নিহত হয় ১৯ জন।

ঘণ্টাখানেক চুপ থাকার পর মেয়ের এসএমএস আসে। পুলিশ বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে বৃষ্টির মতো গুলি করছে। বহু স্টুডেন্টের শরীরে গুলি লেগেছে। বলল, ‘পাখির মতো স্টুডেন্টদের মারছে ওরা।’ মনে হলো কেউ খুব শক্ত হাতে কঠিনভাবে আমার গলা টিপে ধরেছে। শ্বাস নিতে পারছি না। আরেকটি বড় টেক্সট ফোনে ঢুকল, পুলিশের গুলি থামাতে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। হাতে লাঠি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিচ্ছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল হাতে নিয়ে আবার ছুড়ে দিচ্ছে পুলিশের দিকে। সঙ্গে যোগ দিয়েছে ইস্ট ওয়েস্টসহ আরো কয়েকটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা।

প্রাণ বাঁচাতে কানাডিয়ান ইউনিভাসির্টির দোতলায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পুলিশ। তবে সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি আর টিয়ার শেল ছুড়ছে তারা।

এবার আর টেক্সট না, ফোনই করে মেয়ে। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভেতরে ঢুকে ওই পুলিশ সদস্যদের থামাতে যাচ্ছে ওরা। জানিয়েই ফোন কেটে দিল। হতবিহ্বল লাগছিল। এর ৩০-৩৫ মিনিট পর জানালো দোতলায় আটকে পড়া পুলিশ ছাদে উঠে গেছে। ওদের গুলি-টিয়ার শেল শেষ। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দখল করে আছে স্টুডেন্টরা। এক পুলিশ সদস্যকে ওরা ধরে ফেলেছিল। তার কাপড় খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কিছু চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

এর মধ্যেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। উত্তরা, সাভার, যাত্রাবাড়ী রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে টেলিফোনে খবর আসছে। ছাত্র মারা যাওয়ার খবর আসছে। ধানমন্ডিতে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ নিহত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে উত্তরার নর্দান ইউনিভাসিটির আসিফ ও শাকিল নামে দুটি ছেলে। উত্তরায় এপিসি নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে পুলিশ।

দুপুরের দিকে বাড্ডা থেকে সহকর্মী ফোন করলেন। জানালেন, ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের রেসকিউ করার জন্য র‌্যাবের হেলিকপ্টার যাচ্ছে। আমার মেয়ে চাইলে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে। মেয়েকে জানালাম। উত্তরে মেয়ে জানাল, ‘আমি প্রোটেস্ট করতে আসছি। আমি কাওয়ার্ড না। আমি পালাব না।’ ফোনটা বন্ধ করে দিল। আমি কোনোভাবেই আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না।

বিকালে শাহবাগে জড়ো হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। সাড়ে ৫টার দিকে কফিন মিছিল শুরু হতেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্র-জনতা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করে প্রশাসন। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে নিজ ভবনে আটকে পড়েন উপাচার্য। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের উদ্ধার করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় শিক্ষার্থীরা, আহত হয় শতাধিক। সারা দিনে সারা দেশে শুধু পুলিশের হিসাবেই আহত হয় দেড় হাজার মানুষ।

বিকালের দিকে বিটিভির কার্যালয়েও একাধিকবার হামলা চালানো হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় মেয়ে আমাকে ফোন করে। জানায়, এবার সে বাড়ি ফিরতে চায়। রাস্তায় কোনো বাস বা রিকশা নেই। পুলিশ নেই। শিক্ষার্থীরা ফিরছে। তার আর হাঁটার শক্তি নেই। এবার আমি আমার সহকর্মীর সহায়তা নিতে পারলাম। তিনি মেয়েকে নিয়ে অফিসে ফিরলেন। আমার টুকটুকে ফর্সা তালপাতার সিপাই মেয়ে পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। মনে হলো কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। গলার কাছে উঁচু হয়ে আছে ছোট্ট একটি বল । কী ওটা? চামড়া সরে লাল হয়ে আছে জায়গাটা। ছররা বুলেটের টুকরা? মাথা থেকে বলটাকে ঝেড়ে ফেললাম। মেয়ে বেঁচে আছে। সুস্থ। আর কী চাওয়ার আছে?

সিদ্ধান্ত নিলাম পরদিন থেকে চাকরি-বাকরি বাদ। মেয়ের সঙ্গে বিক্ষোভে নামব।

আন্দোলনে ছাত্র নন এমন ব্যক্তিরাও আছেন, দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আন্দোলনে ছাত্র নন এমন ব্যক্তিরাও আছেন, দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

 

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ব্যানারে চলমান ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি মন্তব্য করেছেন, কিছু মহল সরকারকে বিব্রত করতে এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।

এ আন্দোলনে অনেক অছাত্রও এসেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না।’

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দুএকটি জেলায় ও ঢাকায় দুএকটি স্পটে দেখেছি, তাদের সংখ্যা বেশি না যারা এগুলো নিয়ে কথা-বার্তা বলছে। হয়তো মিডিয়াতে এসেছে, এ জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এগুলোতে আমরা মনোযোগ দিচ্ছি না।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকারকে বিব্রত করতে চায় এ রকম কিছু মহল তো আছেই। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা নিজেদের পরিচয় গোপন করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়—সেটা দৃশ্যমান হয়েছে। যারা আন্দোলন করছে, তাদের মধ্যে অনেকেই দেখা গেছে আসলে ছাত্রই না, পরীক্ষার্থীই না।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এমন আন্দোলনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। আর শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের রায় কার্যকর করা হবে।’

জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের গতিপথে আসে বড় পরিবর্তন

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের গতিপথে আসে বড় পরিবর্তন

 

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের সামনে যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো বিশ্ব। আবু সাঈদের রক্তে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ। আবু সাঈদের মৃত্যুতে কেঁপে ওঠে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী মসনদ। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সমর্থকদের হামলায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের পাশাপাশি সারা দেশে আরও পাঁচজন শহীদ হন। আহত হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা। জেলায় জেলায় সংঘর্ষ, বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বগুড়ায় আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা। একদিকে সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা আর অন্যদিকে আওয়ামী সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী এবং প্রশাসন। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও এদিন আন্দোলনে যোগ দেয়। নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আন্দোলন যাবে, আন্দোলন আসবে। কিন্তু ছাত্রলীগ আছে, ছাত্রলীগ থাকবে। সবকিছু মনে রাখা হবে। সবকিছুর জবাব দেওয়া হবে।’ আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক কাজ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। ওইদিন আন্দোলনে ঢাকায় শহীদ হন নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। চট্টগ্রামে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম, এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। ১৬ জুলাই মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা পরদিন ১৭ জুলাইয়ের কর্মসূচি হিসেবে সারা দেশে কফিন মিছিল এবং গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং আন্দোলন দমাতে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শেখ হাসিনা সরকার। শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে হল ত্যাগের নির্দেশ জারি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে মোতায়েন করে বর্ডার গার্ড। এর আগে দুপুর ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন হল থেকে আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন। ঢাবি ছাড়াও অধিভুক্ত সাত কলেজ এবং আশপাশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে জড়ো হন। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগ। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে ছাত্রলীগের ছোড়া ককটেল ও বোমার আঘাতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। আন্দোলনকারী এবং ছাত্রলীগের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা দখলে নেয় আন্দোলনকারীরা। ছাত্রলীগ পিছু হটে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ বক্তব্য প্রত্যাহার, কোটা সংস্কার এবং ছাত্রলীগের হামলার বিচার দাবিতে বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অবরোধে অংশ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় ৮ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী। হলের তালা ভেঙে আন্দোলনে নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে রাবির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আবাসিক হল বঙ্গবন্ধু হলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দিনটিতে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিন্তু পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এখনো যায়নি। আবু সাঈদকে স্মরণে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে।

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে তার স্মৃতি সংরক্ষণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য হাজার কোটি টাকার  প্রকল্প  নেওয়া হলেও দুই বছরেও সেই সব প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। তোরণ, জাদুঘর, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর আর কোনো কাজ হয়নি। এমন প্রশ্ন করলেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, আবু সাঈদকে নিয়ে এমন অবহেলা খুব কষ্ট দেয়। শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বাবা মকবুল হোসেন আরও বলেন, আদালত কনস্টেবলের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু গুলি করার জন্য ওপর লেভেলের অফিসাররা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ভালো করে তদন্ত করে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদ স্মরণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৬ জুলাই আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, লাল ব্যাজ ধারণ, শোক র‌্যালি, শহীদদের কবর জিয়ারত, স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করা হবে। এরপর সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ গেটে লাল ব্যাজ ধারণ ও শোক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিচারণা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ‘জুলাই শহীদ স্মরণে’ বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বিকাল ৫টায় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আসর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

‘মৃত্যুভয়হীন জনতাকে থামাতে পারে না জালিম শাসক’

‘মৃত্যুভয়হীন জনতাকে থামাতে পারে না জালিম শাসক’

 

জালিম শাসকের লেলিয়ে দেওয়া খুনি বাহিনীর সামনে আবু সাঈদের বীরের মতো জীবন উৎসর্গ করার দৃশ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে ওইদিনই লেখা হয়ে যায় শেখ হাসিনার সরকারের মৃত্যু পরোয়ানা। আবু সাঈদকে হত্যার এই দৃশ্য ফ্যাসিবাদের অন্ধ সমর্থক ছাড়া দেশের সব মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে। তাদের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। মানুষের মন থেকে মুহূর্তে যেন মৃত্যুভয় উধাও হয়ে যায়। পরের দিন থেকে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে থাকেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির মতো। কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত রূপ নিতে থাকে সরকার পতনের এক দফায়। ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনীসহ সব নিরাপত্তা বাহিনী, অস্ত্রসহ দলীয় বাহিনীকে নামিয়েও আর পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার পক্ষে।

২০২৪ সালের ১১ জুলাই চীন থেকে অপমানিত হয়ে দেশে ফেরেন ভারতের তাঁবেদার শেখ হাসিনা। ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে? এর প্রতিবাদে ওইদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাবির রাতের ক্যাম্পাস। পরের দিন সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনার রাজাকার-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, তাদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী ও বহিরাগত অছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অনেকে আহত হন। এ হামলার ঘটনার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব নামকরা কলেজসহ অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন দেশের তরুণ সমাজসহ অনেকে। ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার,’ ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর। বেসামাল সরকার আন্দোলন দমনে পুলিশের পাশাপাশি লেলিয়ে দেয় দলীয় ও ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের। দলের সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রের অস্ত্র।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ফুঁসে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। ১৬ জুলাই সকাল থেকে ছাত্রীরাসহ সব বাসিক হলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। তাদের দমনে পুলিশসহ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান নেয় টিএসসি এলাকায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের গণজোয়ারের মুখে দুপুরের পর ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। ক্যাম্পাসজুড়ে দিনভর বিক্ষোভের পর বিকাল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হতে থাকেন শহীদ মিনারে। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসজুড়ে র‌্যালি করার পর তারা শেষ করেন ওইদিনের কর্মসূচি।

রামপুরা ব্রিজ থেকে নতুনবাজার ছাড়িয়ে বিশ্বরোড পর্যন্ত ১৬ জুলাই দিনভার বিক্ষোভ মিছিল করেন ওই এলাকায় অবস্থিত ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট, ইউনাইটেড, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ আরো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ঢাকার সায়েন্সল্যাব এলাকা, মহাখালীতে তিতুমীর, বিএফ শাহীন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার ও রাজাকারের নাতিপুতি ইস্যুতে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ করেন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করতে থাকেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। এতে ওইদিন অনেকে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ছয়জনের পরিচয় পরে শনাক্ত করা গেছে।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু শেখ হাসিনার খুনি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র একজন শিক্ষার্থীর ওপর খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি চালাতে থাকে। শরীরে গুলি লাগার পরও আবু সাঈদ দৌড়ে পালাননি; বরং তিনি বারবার একই ভঙ্গিতে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার সতীর্থরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরে তিনি শাহাদতবরণ করেন ।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশে হাসিনা পতন আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’র মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাসিনা পতন আন্দোলনে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তাদের অধিকাংশ নিহত হয়েছেন ১৯ জুলাই। ১৮ জুলাইও অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১৬ জুলাই শহীদ দিবস ঘোষণা করা হয়েছে আবু সাঈদের শাহাদতের স্মরণে। কারণ এই শাহাদতের মাধ্যমেই লেখা হয়েছিল হাসিনার পতন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ষোলশহর, মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। একই ঘটনায় ওইদিন মুরাদপুরে শহীদ হন ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত। এদিন বহদ্দারহাট-ষোলশহর, চট্টগ্রাম আসবাবপত্রের দোকানের ফারুক নামের এক কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করেন।

ঢাকার সায়েন্সল্যাব-সিটি কলেজ এলাকায় গুরুতর আহত হয়ে শাহাদতবরণ করেন শাহজাহান নামের একজন হকার। ঢাকা কলেজ এলাকায় সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ আলী।

১৬ ‍জুলাই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার ওইদিন রাতেই সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। ৫ আগস্ট পতনের আগ পর্যন্ত সরকার দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ এবং কারফিউ জারি করে। আন্দোলন দমনে গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, তীব্র ভয়ভীতি ছড়িয়ে দেওয়াসহ যাবতীয় দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু জালিম শাসকের বিরুদ্ধে গণমানুষের যখন মৃত্যুভয় দূর হয়ে যায়, তখন আর কোনো কিছুতেই তাদের দমন করা যায় না।

লুটেরা, খুনি, মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনারও শেষ রক্ষা হয়নি। তীব্র গণরোষের মুখে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তিনি তার প্রভুদেশ ভারতে পালিয়ে যান। দেশবাসী তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো রাস্তায় নেমে আসেন স্লোগান দিতে দিতে—‘এই মাত্র খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল।’ শেখ হাসিনার মতো জালিম শাসক আর ভারতের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে আবু সাঈদসহ যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অবর্ণনীয় নির্যাতন ও ত্যাগ স্বীকার করেছন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাদের ঋণ কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।

১০ ঘণ্টা পর পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত, আসছে নতুন কর্মসূচি

১০ ঘণ্টা পর পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত, আসছে নতুন কর্মসূচি


 প্রায় ১০ ঘণ্টা আন্দোলনের পর রাজপথের অবরোধ তুলে নিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে তারা নতুন কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আন্দোলনকারীরা এ ঘোষণা দেন। পরে তারা সেখান থেকে সরে গেলে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা তাদের তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে তারা জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে যান। পরে বিকেলে সংসদ ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে তারা অবস্থান চালিয়ে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সন্ধ্যায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন।

পরে পুলিশ সংসদ ভবনের সামনের এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিলে তারা আসাদগেটের আড়ং মোড় এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় উত্তেজিত কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ আবারও ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তবে শিক্ষার্থীরা সেখানে আবার জড়ো হন। এ সময় একটি বাস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, বাস ভাঙচুরে জড়িতরা শিক্ষার্থী নন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিতভাবে এ কাজ করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা দুর্যোগ পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত, ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একজন আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে। তবে আজকের (মঙ্গলবার) আন্দোলন এখানেই স্থগিত করা হলো। পরবর্তীতে নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সূত্র: আমার দেশ