The National Press
সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...
৫ আগস্ট: আজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস

৫ আগস্ট: আজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস

আজ ৫ আগস্ট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস। দিনটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ, আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা তুলে ধরতে রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে শহীদদের কবর জিয়ারত, স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, র‍্যালি এবং গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন তাদের পৃথক বিবৃতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে সকাল থেকেই মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও নানা আয়োজনে দিনটি পালিত হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব সংগঠনকে এনসিপির কৃতজ্ঞতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব সংগঠনকে এনসিপির কৃতজ্ঞতা


ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রক্তাক্ত জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় দলটি জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী ও জুলাইপন্থি সব ছাত্রসংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের অবদান তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।

এনসিপি আরও জানায়, গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। সংগঠনটি আন্দোলনে অবদান রাখা সব ব্যক্তি ও সংগঠনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানিয়েছে।

৪ আগস্ট: এক দিনের অসহযোগে রক্তাক্ত বাংলাদেশ, পরদিনই চূড়ান্ত ডাক ‘মার্চ টু ঢাকা’

৪ আগস্ট: এক দিনের অসহযোগে রক্তাক্ত বাংলাদেশ, পরদিনই চূড়ান্ত ডাক ‘মার্চ টু ঢাকা’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ও স্মরণীয় দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিনেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় উত্তাল হয়ে ওঠে। দিনভর সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর আসে এবং আহত হন কয়েক হাজার মানুষ। সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহই পরদিন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির পথ তৈরি করে।

সকালে বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডা, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ চলাকালে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, ছররা গুলি এবং বিভিন্ন ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা হয়। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরাও বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মিছিল এবং প্রতিরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন।

দিনভর সংঘর্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হন। এছাড়া ঢাকা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নরসিংদী, বগুড়া, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, মাগুরা, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় বহু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

এদিকে সংঘর্ষের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, সরকারি স্থাপনা, থানা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং জনপ্রতিনিধিদের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা যায়।

বিকেলের দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা শাহবাগে সমাবেশ থেকে পূর্বঘোষিত ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা আন্দোলনকারীদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।

সন্ধ্যায় সরকার রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন এবং তিন দিনের সরকারি ছুটির ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে।

৪ আগস্টের ঘটনাবলি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই দিনের সহিংসতা ও প্রাণহানির পরের দিন ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের গতিপথে আসে বড় পরিবর্তন

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের গতিপথে আসে বড় পরিবর্তন

 

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের সামনে যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো বিশ্ব। আবু সাঈদের রক্তে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ। আবু সাঈদের মৃত্যুতে কেঁপে ওঠে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী মসনদ। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সমর্থকদের হামলায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের পাশাপাশি সারা দেশে আরও পাঁচজন শহীদ হন। আহত হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা। জেলায় জেলায় সংঘর্ষ, বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বগুড়ায় আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা। একদিকে সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা আর অন্যদিকে আওয়ামী সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী এবং প্রশাসন। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও এদিন আন্দোলনে যোগ দেয়। নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আন্দোলন যাবে, আন্দোলন আসবে। কিন্তু ছাত্রলীগ আছে, ছাত্রলীগ থাকবে। সবকিছু মনে রাখা হবে। সবকিছুর জবাব দেওয়া হবে।’ আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক কাজ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। ওইদিন আন্দোলনে ঢাকায় শহীদ হন নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। চট্টগ্রামে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম, এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। ১৬ জুলাই মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা পরদিন ১৭ জুলাইয়ের কর্মসূচি হিসেবে সারা দেশে কফিন মিছিল এবং গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করে। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং আন্দোলন দমাতে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শেখ হাসিনা সরকার। শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে হল ত্যাগের নির্দেশ জারি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে মোতায়েন করে বর্ডার গার্ড। এর আগে দুপুর ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন হল থেকে আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন। ঢাবি ছাড়াও অধিভুক্ত সাত কলেজ এবং আশপাশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে জড়ো হন। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগ। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে ছাত্রলীগের ছোড়া ককটেল ও বোমার আঘাতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। আন্দোলনকারী এবং ছাত্রলীগের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা দখলে নেয় আন্দোলনকারীরা। ছাত্রলীগ পিছু হটে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ বক্তব্য প্রত্যাহার, কোটা সংস্কার এবং ছাত্রলীগের হামলার বিচার দাবিতে বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অবরোধে অংশ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় ৮ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী। হলের তালা ভেঙে আন্দোলনে নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে রাবির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আবাসিক হল বঙ্গবন্ধু হলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দিনটিতে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিন্তু পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এখনো যায়নি। আবু সাঈদকে স্মরণে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে।

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে তার স্মৃতি সংরক্ষণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য হাজার কোটি টাকার  প্রকল্প  নেওয়া হলেও দুই বছরেও সেই সব প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। তোরণ, জাদুঘর, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর আর কোনো কাজ হয়নি। এমন প্রশ্ন করলেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, আবু সাঈদকে নিয়ে এমন অবহেলা খুব কষ্ট দেয়। শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বাবা মকবুল হোসেন আরও বলেন, আদালত কনস্টেবলের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু গুলি করার জন্য ওপর লেভেলের অফিসাররা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ভালো করে তদন্ত করে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদ স্মরণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৬ জুলাই আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, লাল ব্যাজ ধারণ, শোক র‌্যালি, শহীদদের কবর জিয়ারত, স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করা হবে। এরপর সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ গেটে লাল ব্যাজ ধারণ ও শোক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিচারণা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ‘জুলাই শহীদ স্মরণে’ বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বিকাল ৫টায় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আসর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

‘মৃত্যুভয়হীন জনতাকে থামাতে পারে না জালিম শাসক’

‘মৃত্যুভয়হীন জনতাকে থামাতে পারে না জালিম শাসক’

 

জালিম শাসকের লেলিয়ে দেওয়া খুনি বাহিনীর সামনে আবু সাঈদের বীরের মতো জীবন উৎসর্গ করার দৃশ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে ওইদিনই লেখা হয়ে যায় শেখ হাসিনার সরকারের মৃত্যু পরোয়ানা। আবু সাঈদকে হত্যার এই দৃশ্য ফ্যাসিবাদের অন্ধ সমর্থক ছাড়া দেশের সব মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে। তাদের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। মানুষের মন থেকে মুহূর্তে যেন মৃত্যুভয় উধাও হয়ে যায়। পরের দিন থেকে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে থাকেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির মতো। কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত রূপ নিতে থাকে সরকার পতনের এক দফায়। ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনীসহ সব নিরাপত্তা বাহিনী, অস্ত্রসহ দলীয় বাহিনীকে নামিয়েও আর পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার পক্ষে।

২০২৪ সালের ১১ জুলাই চীন থেকে অপমানিত হয়ে দেশে ফেরেন ভারতের তাঁবেদার শেখ হাসিনা। ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে? এর প্রতিবাদে ওইদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাবির রাতের ক্যাম্পাস। পরের দিন সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনার রাজাকার-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, তাদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী ও বহিরাগত অছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অনেকে আহত হন। এ হামলার ঘটনার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব নামকরা কলেজসহ অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন দেশের তরুণ সমাজসহ অনেকে। ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার,’ ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর। বেসামাল সরকার আন্দোলন দমনে পুলিশের পাশাপাশি লেলিয়ে দেয় দলীয় ও ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের। দলের সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রের অস্ত্র।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ফুঁসে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। ১৬ জুলাই সকাল থেকে ছাত্রীরাসহ সব বাসিক হলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। তাদের দমনে পুলিশসহ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান নেয় টিএসসি এলাকায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের গণজোয়ারের মুখে দুপুরের পর ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। ক্যাম্পাসজুড়ে দিনভর বিক্ষোভের পর বিকাল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হতে থাকেন শহীদ মিনারে। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসজুড়ে র‌্যালি করার পর তারা শেষ করেন ওইদিনের কর্মসূচি।

রামপুরা ব্রিজ থেকে নতুনবাজার ছাড়িয়ে বিশ্বরোড পর্যন্ত ১৬ জুলাই দিনভার বিক্ষোভ মিছিল করেন ওই এলাকায় অবস্থিত ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট, ইউনাইটেড, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ আরো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ঢাকার সায়েন্সল্যাব এলাকা, মহাখালীতে তিতুমীর, বিএফ শাহীন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার ও রাজাকারের নাতিপুতি ইস্যুতে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ করেন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করতে থাকেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। এতে ওইদিন অনেকে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ছয়জনের পরিচয় পরে শনাক্ত করা গেছে।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু শেখ হাসিনার খুনি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র একজন শিক্ষার্থীর ওপর খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি চালাতে থাকে। শরীরে গুলি লাগার পরও আবু সাঈদ দৌড়ে পালাননি; বরং তিনি বারবার একই ভঙ্গিতে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার সতীর্থরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরে তিনি শাহাদতবরণ করেন ।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশে হাসিনা পতন আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’র মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাসিনা পতন আন্দোলনে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তাদের অধিকাংশ নিহত হয়েছেন ১৯ জুলাই। ১৮ জুলাইও অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১৬ জুলাই শহীদ দিবস ঘোষণা করা হয়েছে আবু সাঈদের শাহাদতের স্মরণে। কারণ এই শাহাদতের মাধ্যমেই লেখা হয়েছিল হাসিনার পতন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ষোলশহর, মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। একই ঘটনায় ওইদিন মুরাদপুরে শহীদ হন ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত। এদিন বহদ্দারহাট-ষোলশহর, চট্টগ্রাম আসবাবপত্রের দোকানের ফারুক নামের এক কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করেন।

ঢাকার সায়েন্সল্যাব-সিটি কলেজ এলাকায় গুরুতর আহত হয়ে শাহাদতবরণ করেন শাহজাহান নামের একজন হকার। ঢাকা কলেজ এলাকায় সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ আলী।

১৬ ‍জুলাই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার ওইদিন রাতেই সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। ৫ আগস্ট পতনের আগ পর্যন্ত সরকার দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ এবং কারফিউ জারি করে। আন্দোলন দমনে গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, তীব্র ভয়ভীতি ছড়িয়ে দেওয়াসহ যাবতীয় দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু জালিম শাসকের বিরুদ্ধে গণমানুষের যখন মৃত্যুভয় দূর হয়ে যায়, তখন আর কোনো কিছুতেই তাদের দমন করা যায় না।

লুটেরা, খুনি, মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনারও শেষ রক্ষা হয়নি। তীব্র গণরোষের মুখে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তিনি তার প্রভুদেশ ভারতে পালিয়ে যান। দেশবাসী তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো রাস্তায় নেমে আসেন স্লোগান দিতে দিতে—‘এই মাত্র খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল।’ শেখ হাসিনার মতো জালিম শাসক আর ভারতের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে আবু সাঈদসহ যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অবর্ণনীয় নির্যাতন ও ত্যাগ স্বীকার করেছন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাদের ঋণ কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।