আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি'— শেষ ভয়েস মেসেজে মোহন
নওগাঁ প্রতিনিধি:বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল—মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করবো। আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না।’
সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন নিহত সুমন ও মোহনের মা ময়না খাতুন।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে নিহতদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
এর আগে রোববার দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে গন্ডগোহালী গ্রামের দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক নিহত হন। একই গ্রামের আরও দুজন এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহতদের মা ময়না খাতুন বলেন, ‘কালকে মেজো ব্যাটার সঙ্গে সকালে কথা কইছি। ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও, সুস্থ থাকো—এই কথা কইছিল। আগুন লাগার পর ছাওয়াল ভয়েস ম্যাসেজ দিছে। কইছে, মা, দুইডা কথা কমু, আমি আর কথা কমু না নে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুই বাবাকে আমার বুকে অ্যানা দেও বাবা। আমার বাবাদেরকে দেখে আমি কলিজা শান্ত করমু। বড় কষ্টের ছাওয়াল, আমার দুই ধনক আমার বুকে অ্যানা দে বাবা রে।’
মোহনের বিয়ের কথা মনে করে মা বলেন, ‘মোহন বলতেছিল—এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু।’
এদিকে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের সুমন (৩৫) ও হাসিবুল হাসান শুভ (২৭), কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক, সুমন প্রামাণিক, রুবেল হোসেন (৩০) ও কলি প্রামাণিক (৩৫), পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল (৩৮), বিশা গ্রামের সাগর (৩১) ও মজিদুল (৩৪) এবং উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২)।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য ও মরদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে চূড়ান্ত তথ্যের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।