The Future Press
ব্রেকিং নিউজ
লোড হচ্ছে...

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে ৪-৫ বছর লাগবে

Saturday, June 13, 2026 The Future press
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে ৪-৫ বছর লাগবে

 


সবার জন্য বাজেট দেয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেটা স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে নিতে সময় লাগবে। আগামী দুই বছর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে তোলাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এজন্য শিক্ষা, কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যাতে দেশের ভেতরে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং শ্রমিকরা উচ্চ আয়ের চাকরি পেতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, বর্তমানে নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষি খাত, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার এখন বড় বড় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পে ‘ভ্যালু ফর মানি’ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং অর্থ সচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার।

বাজেটে সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এখন সরকারি অফিসে দুর্নীতি কমবে কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার কথা। কারণ অভাব থাকলে দুর্নীতির একটা প্রবণতা থাকে। ১১ বছর ধরে পে-স্কেল হয়নি, অন্য দিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সুতরাং এটা সমন্বয় করা দরকার। বেতন বাড়লে, আয় বাড়বে তখন নিশ্চয় দুর্নীতি কমার কথা।

বাজেটে কর্মসংস্থানের বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেটে পরিষ্কারভাবে বলা আছে চাকরির কথা। আমরা আশা করি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব। বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছি কর্মসংস্থানের জন্য। স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য আমরা জোর দিচ্ছি। দক্ষ একজন শ্রমিকের চাকরি দেশে-বিদেশে হওয়া খুবই সহজ। এই জন্য আমরা স্কিল ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত নানান প্রকল্প হাতে নিচ্ছি।

বাজার বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশ, র‌্যাব কিংবা সরকারি লোক দিয়ে পিটিয়ে করার বিষয় না, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা এমন মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সঠিক পলিসি ও ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে।

সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আপনারা তো জানেন মূল্যস্ফীতি গত তিন মাসের ব্যাপার না, এটি বেশ কয়েক বছর ধরেই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং গত তিন মাস ধরে তা ৯ শতাংশের ওপরে চলছে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিগ্রহ এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, লুটপাট ও মানি লন্ডারিংয়ের কারণে ব্যাংকগুলোতে বিরাট ক্যাপিটাল (মূলধন) ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ‘কস্ট অব ফান্ড’ অনেক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটছে মূল্যস্ফীতির ওপর। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানিকৃত সব পণ্যের দামই দেশের বাজারে বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি জানান, বহির্বিশ্বের কারণে যে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সেখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে অভ্যন্তরীণভাবে কিভাবে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ইজ অব ডুইং বিজনেস (সহজে ব্যবসা করার সূচক) মানদণ্ডে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ একেবারে তলানীতে। এর অর্থ হলো আমাদের ব্যবসার খরচ অনেক বেশি। একটি পারমিশন পেতে বা কোম্পানি করতে ছয় মাস থেকে এক বছর লেগে যায়। অনেক ডিপার্টমেন্টে যেতে হয়, সময় নষ্ট হয় এবং অনেক জায়গায় তাদের খরচ (ঘুষ/অনিয়ম) করতে হয় এটা তো সত্য কথা।

স্পট বায়িং বন্ধ, ৩ মাসের বাফার স্টকের পরিকল্পনা : জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্পট মার্কেট (তাৎক্ষণিক ক্রয়) থেকে কেনার কারণে খরচের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দুই-তিন ঘণ্টার নোটিশে বেশি দামে কিনতে হয়। অতীতে এই দীর্ঘমেয়াদি অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো করা হয়নি। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রোপার প্ল্যানিং দরকার। ভবিষ্যৎ সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের রিজার্ভ বা নিয়ন্ত্রণে কমপক্ষে তিন মাসের জ্বালানি ও খাদ্যমজুদ রাখার মতো বাফার স্টক গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের পোর্টগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও বাড়তি খরচ কমাতে পারলে সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী হবে এবং দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিনিয়োগ বাধা দূর করতে টাস্কফোর্স হবে : বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা কমানোর (ডিরেগুলেশন) উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একইসাথে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, বিলম্ব কিংবা অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা যাতে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইটও চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ নীতিমালা কোথায় লঙ্ঘিত হচ্ছে, কে বাধা সৃষ্টি করছে কিংবা কোথায় প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে– এসব বিষয় টাস্কফোর্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বা ‘পিপলস ইকোনমি’ বাস্তবায়ন শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বেসরকারি খাত, এনজিও এবং বিভিন্ন অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘বরিশালের কোনো প্রান্তিক নারী যদি শীতল পাটি তৈরি করেন, তাহলে সেই পণ্যের নকশা উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ৭০০ টাকার পণ্যকে ২ হাজার টাকার পণ্যে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা বাজেটের পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারব কিনা তা সময়ই বলবে। তবে যদি ঘোষিত কর্মসূচির ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।