লোহিত সাগর কি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে?
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছে গোষ্ঠীটির এই অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য—সবকিছু নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোকা দখলের দাবি করে হুথিরা। এর ফলে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর তাদের সামরিক চাপ আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই পথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচল ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি তেল রপ্তানিতে বড় ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ উদ্দেশ্যে দেশটি প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইন ব্যবহার করছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের উপকূলে পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে।
চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৌদি তেল পরিবহনে বাব আল-মান্দেবের ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে হুথিদের হাতে ইয়েমেনের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হলে সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে হুথিরা।
হুথিদের শক্তি কতটা?
ইয়েমেনে প্রায় এক দশক ধরে সংঘাত চলছে। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা ও হুদাইদাহ দখলের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এর পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ইরানের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে দ্রুত সামরিক অগ্রগতি ধরে রেখে দীর্ঘ সময় একটি বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পুরো নৌপথ বন্ধ করা কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের পক্ষে সরাসরি পুরো বাব আল-মান্দেব বা লোহিত সাগর দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা কঠিন হতে পারে। কিন্তু সেটি পুরোপুরি বন্ধ না করেও নৌপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা সম্ভব।
কারণ কোনো একটি নৌপথ নিরাপদ নয়—এমন আশঙ্কা তৈরি হলেই জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলো বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি বাহিনী ইতোমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব হামলা তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইলেও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে কি না, তা অনিশ্চিত। ফলে রিয়াদের সামনে একদিকে সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করার চাপ, অন্যদিকে বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রয়োজন—দুই ধরনের হিসাবই রয়েছে।
সব মিলিয়ে হুথিরা লোহিত সাগর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে তাদের সামরিক উপস্থিতি যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সৌদি তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তাও তত বাড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা