শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন, আলোচনায় ১৫ বছরের শাসনামলের বিতর্কিত অধ্যায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনার শাসনামল, তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরের শাসনকালে মানবাধিকার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো আবারও সামনে এসেছে।
গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে এ সময়ের গুম ও নিখোঁজের ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলা এডিশনের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের বরাতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ৬৭৭ জন গুমের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর সুরাহা এখনো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক সহিংসতা
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিগত সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, টেকনাফে মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা এবং বিভিন্ন সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলো এ সময়ের আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেশের ব্যাংকিং খাত, বড় উন্নয়ন প্রকল্প এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, পিকে হালদার এবং এস আলম গ্রুপকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিভিন্ন বিশ্লেষণেও ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া অর্থ পাচার ও বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত ও আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা।
নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে ব্যালট পূরণের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি করে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলাদা তদন্ত ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও সরকারের পতন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনটি সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের অনুসন্ধানে ওই সময়ের সহিংসতা ও প্রাণহানির বিষয়ে গুরুতর তথ্য উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছাড়েন।
দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা
বর্তমানে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তাঁর সমর্থকদের একাংশ দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে প্রচার চালালেও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ও জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর বক্তব্যে বিচার ও জবাবদিহির দাবি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু দেশে ফেরার প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও তাঁর দেশে ফেরার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের বিতর্কিত ঘটনাগুলো এবং সেসবের বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
