The National Press
সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

মুসলিমদের শত্রু হিসেবে পরিচিত ভারত কীভাবে আফগানিস্তানের বন্ধু হলো?

Sunday, August 16, 2026 The National Press
মুসলিমদের শত্রু হিসেবে পরিচিত ভারত কীভাবে আফগানিস্তানের বন্ধু হলো?

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক যখন তীব্র উত্তেজনার দিকে যাচ্ছে, তখন কাবুলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আদর্শগতভাবে ভারত ও তালেবানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও কৌশলগত ও আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের বিমান হামলার পর ভারত বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, আফগান ভূখণ্ড থেকে ভারতবিরোধী নয়, বরং ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তানবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। ভারত অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কে তিক্ততা

একসময় পাকিস্তানকে তালেবানের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে সম্পর্ক বেশ খারাপ। সীমান্ত সংঘাত, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যু এবং আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোসহ বিভিন্ন বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অভিযোগ করেছেন, ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর দেশটি ভারতের প্রভাববলয়ে চলে গেছে। তার দাবি, কাবুল এখন ভারতের একটি প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে এবং আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে তালেবানের যোগাযোগ বাড়ছে

তালেবান ২০২১ সালে আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর ভারত প্রথমদিকে সতর্ক অবস্থান নেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। ২০২২ সালে ভারত কাবুলে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠায়। এরপর দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে ভারতও আফগানিস্তানের সঙ্গে অর্থনীতি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।

দীর্ঘদিনের ভারতীয় বিনিয়োগ

আফগানিস্তানে ভারতের উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারত আফগানিস্তানে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কাবুলের সংসদ ভবন, জারাঞ্জ-দিলারাম মহাসড়ক ও সালমা বাঁধসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ভারতের ভূমিকা রয়েছে।

এ ছাড়া ভারত আফগানিস্তানকে বিভিন্ন সময় বাস, সরকারি যানবাহন, সামরিক যান ও অ্যাম্বুলেন্সসহ নানা ধরনের সহায়তা দিয়েছে। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের সময় খাদ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবাও সরবরাহ করেছে।

ক্রিকেটেও ভারতের ‘সফট পাওয়ার’

আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার অন্যতম দিক হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। আফগান ক্রিকেট দলকে ভারতের মাঠে নিজেদের হোম ভেন্যু ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দেশটির ক্রিকেটাররা নিয়মিত আইপিএলসহ বিভিন্ন ভারতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। ফলে আফগান তরুণদের মধ্যেও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে।

কেন বদলেছে সমীকরণ?

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও তালেবানের মধ্যে আদর্শগত মিল না থাকলেও উভয়ের কৌশলগত স্বার্থের জায়গায় কিছুটা মিল তৈরি হয়েছে। তালেবান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ চায়। অন্যদিকে ভারত আফগানিস্তানে নিজের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি পাকিস্তানের ওপর আঞ্চলিক চাপ তৈরির সুযোগ দেখছে।

তালেবান সরকার এখনো আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি। রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে আফগানিস্তানের জন্য বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনার বিপরীতে দিল্লি-কাবুল সম্পর্কের এই পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।