The National Press ​
সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত, মাসিক ব্যয়ের চেয়ে আয় কম

Sunday, October 18, 2026 The National Press
দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত, মাসিক ব্যয়ের চেয়ে আয় কম

নিজস্ব প্রতিবেদক: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে আর্থিক সংকটে পড়েছে দেশের বহু পরিবার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় সংসার চালাতে অনেককেই ধারদেনার আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

বিবিএসের ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক জরিপে পরিবারের আয়, ব্যয় ও ঋণগ্রস্ততার এই চিত্র উঠে এসেছে। জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে পরিচালিত জরিপটির তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলা এডিশন।

জরিপের হিসাব অনুযায়ী, দেশে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় একটি পরিবারকে গড়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

গ্রামে ঋণগ্রস্ততার হার বেশি

জরিপে শহর ও গ্রামের পরিবারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতায় পার্থক্য দেখা গেছে। গত এক বছরে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গ্রামীণ এলাকার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।

ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যান্য শহরাঞ্চলে এ ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।

জরিপ অনুযায়ী, পরিবারের মোট ব্যয়ের বড় একটি অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে খরচ হয়। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

আগের তুলনায় বদলেছে আয়-ব্যয়ের চিত্র

বিবিএসের ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। ওই সময় গড় ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ তখন গড় আয়ের তুলনায় ব্যয় কম ছিল।

নতুন জরিপের তথ্য বলছে, বর্তমানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। পরিবারপ্রতি গড় ব্যয় এখন আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে সঞ্চয় কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নবম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ তৈরিতে সহায়তার জন্য জরিপটি পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ৩ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে বিবিএস।

মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটের প্রভাব

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং প্রকৃত মজুরি হ্রাস মানুষের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় একই অনুপাতে না বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কাজের সুযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য তুলনামূলক সীমিত থাকায় সেখানকার পরিবারগুলো বেশি চাপের মুখে রয়েছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সুবিধা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছায় বলেও উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ। ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণ নিতে হচ্ছে।

দারিদ্র্য বৃদ্ধির আশঙ্কা

বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং শিল্প খাতে নতুন চাকরি তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বিবিএসের জরিপে উঠে আসা তথ্য দেশের পরিবারগুলোর আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা ও ঋণনির্ভরতার চাপ তুলে ধরেছে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না ফিরলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।