খাবারের সঙ্গে শরীরে ঢুকছে ‘নীরব বিষ’, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ খাবার ও খাদ্যদূষণের প্রভাবে তাৎক্ষণিক অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনিরাপদ খাবারের কারণে ২০০টিরও বেশি রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
ব্রয়লার মুরগি নিয়েও উদ্বেগ
দেশের মানুষের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্রয়লার মুরগির চাহিদা অনেক। তবে মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থাকার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর তার অবশিষ্টাংশ মাংসে থেকে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন খাবার গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ উৎপাদন ও যথাযথ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফল-সবজি ও মিষ্টিতেও প্রশ্ন
শুধু মাংস নয়, ফলমূল ও শাকসবজিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। একইভাবে কেক ও জিলাপির মতো জনপ্রিয় খাবারে অননুমোদিত রং বা রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ক্ষতিকর উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
পাউরুটিতেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের তথ্য
পাউরুটি অনেকের প্রতিদিনের খাবারের অংশ। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষদের জন্য এটি সহজলভ্য খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ২০২১ সালের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৯টি পাউরুটির মধ্যে ১৬টিতে অতিরিক্ত মাত্রায় পটাশিয়াম ব্রোমেট পাওয়া গিয়েছিল।
গবেষণায় এসব নমুনায় পটাশিয়াম ব্রোমেটের মাত্রা ৩ দশমিক ৩১ থেকে ১২ দশমিক ৯১ পিপিএম পর্যন্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিলাপি নিয়েও সতর্কতার প্রয়োজন
বাঙালির প্রিয় মিষ্টান্ন জিলাপি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। জিলাপিকে দীর্ঘক্ষণ মুচমুচে রাখা কিংবা দেখতে আকর্ষণীয় করতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। তাই খাবার তৈরির ক্ষেত্রে অনুমোদিত উপকরণ ব্যবহার এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জরুরি।
টুথপেস্টেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
খাদ্যের বাইরেও নিত্যব্যবহার্য পণ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ESDO) একটি গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে পাওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।
গবেষণাসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কঠোর নজরদারির দাবি
খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি উৎপাদন পর্যায় থেকেই নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জব্বার মন্ডল বলেন, ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানো চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু ভোক্তার সচেতনতা যথেষ্ট নয়। উৎপাদক, ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত পরীক্ষা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।