ইরানের নতুন নেতৃত্ব যেসব জায়গায় পুরোনোদের থেকে আলাদা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, সে সময় অনেকে একে ইতিহাসের এক চরম পরিহাস হিসেবে দেখেন।
আতিথেয়তা দেওয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ হয়তো ট্রাম্প মত বদলানোর আগেই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়াটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পকে খুশি করতে তিনি সম্ভবত রাজকীয় ‘হল অব মিররস’ ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
তবে ভেন্যু বাছাইয়ের বিষয়টি অবধারিতভাবে দেড় পৃষ্ঠার এই চুক্তির সঙ্গে ১৯১৯ সালের বিশাল ভার্সাই চুক্তির তুলনা সামনে নিয়ে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ওই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়েছিল।
১৯১৯ সালের সেই চুক্তি ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। তবে চুক্তিতে যুদ্ধের যে বিশাল ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছিল, তা জার্মানিকে ক্ষুব্ধ ও তিক্ত করে তোলে। আর সেটাই মাত্র ২০ বছর পরে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চ তৈরিতে সহায়তা করে।
ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তি অনেক দিক থেকেই আলাদা। তারপরও প্রশ্ন জাগে, এটিও কি একইভাবে ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে? প্রায় তিন সপ্তাহ পরেও ভঙ্গুর হলেও যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে বজায় রয়েছে।
১৯১৯ সালের সেই চুক্তি ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। তবে চুক্তিতে যুদ্ধের যে বিশাল ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছিল, তা জার্মানিকে ক্ষুব্ধ ও তিক্ত করে তোলে। আর সেটাই মাত্র ২০ বছর পরে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চ তৈরিতে সহায়তা করে।
তবে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ হয়েছে। যুদ্ধের মূল কারণগুলোর কোনোটিও সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগের মতোই চরম অনিশ্চিত রয়ে গেছে। তবে এরই মধ্যে ইরানে এক গভীর পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
দেশটি এখন তাদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষবিদায় জানাচ্ছে। চার মাসের বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয় এবং তেহরান প্রশাসনের নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হত্যা করা হয়।
এটি এক বড় ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পুরোনো নেতৃত্ব নতুনদের পথ দেখিয়ে গেছে। নতুন এই নেতৃত্বের হাত ধরে আসছে নতুন কর্মপন্থা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো ইরানের অনেক সাবেক নেতাকে হত্যা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখন কি তবে তাদের জায়গায় আরও শক্তিশালী ও ভয়ংকর কোনো শত্রু তৈরি হলো?
দাবার ছকে নতুন বিন্যাস
জনস হপকিনস স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য স্টাডিজের অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত যেমনটা ভেবেছি, এই যুদ্ধের পরিণতি তার চেয়ে অনেক বড়।’
ভ্যালি নাসর বলেন, ‘এই মাত্রার সব বড় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দাবার ছক নতুন করে সাজায়। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই কাজ করবে।’
গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়েই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
কয়েক দশক ধরে চলমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিধ্বস্ত ছিল। এর ওপর ছয় মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের একটি যুদ্ধের ক্ষতও দেশটি তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে তাদের সুবিধা আদায়ের একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি এটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন। কিন্তু তা ধ্বংস না হলেও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
‘পুরো এক নতুন প্রজন্ম এখন ক্ষমতায়। তাদের একটি খুব স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তারা যুদ্ধ সামলেছে এবং এখন তারা শান্তিপ্রক্রিয়াও সামলাতে যাচ্ছে।’অধ্যাপক ভ্যালি নাসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য স্টাডিজ, জনস হপকিনস স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ।
ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুতের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কাছে যে ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা আরও সমৃদ্ধ করা হয়ে থাকলে সেগুলো দিয়ে ১০ থেকে ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। ধারণা করা হচ্ছে, এই মজুতের একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের মিত্র ও অনুসারীদের একটি জোট আছে। এটি ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) নামে পরিচিত। এই জোটও একের পর এক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছিল। সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে তারা ক্ষমতা হারায়।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছে ইসরায়েল। পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের মাধ্যমে তারা হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
গাজা উপত্যকায় ইরানের আরেক মিত্র হামাসও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস ইসরায়েলে ভয়াবহ হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় অবিরাম আক্রমণ শুরু করে। তারা গাজার বিশাল অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাঁদের দুজনেরই শক্তিশালী ইরানিয়ান রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘তাঁরা বিপ্লবের সন্তান।’
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার জবাবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তারা লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজেও হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পাল্টা হামলা চালায়। তাদের কোনো কোনো হামলায় গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
দেশে-বিদেশে এমন অনেক বিপর্যয়ের পর সবার মধ্যে এই ধারণা জন্মেছিল যে ইরান এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে।
ইরান যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে, এমন চিন্তা তখন অবাস্তব মনে হয়েছিল।
অথচ শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো টিকে আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। মূলত এই সক্ষমতাই তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।