The National Press
সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

১২ কোটি টাকার সেতু তৈরি, তবু নদী পার হতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো দিয়ে

Tuesday, August 11, 2026 The National Press
১২ কোটি টাকার সেতু তৈরি, তবু নদী পার হতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো দিয়ে

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঘড়িসার ইউনিয়নে হুগলী নদীর ওপর প্রায় ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি দুই বছর ধরে পড়ে আছে। সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও পশ্চিম পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় এটি এখনো যানবাহন চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে নদী পারাপারে স্থানীয়দের ভরসা এখনো বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষের নড়িয়া উপজেলা সদরে যাতায়াত সহজ করতে থিরপাড়া এলাকায় হুগলী নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য নিয়াজ-আরকে নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে প্রায় ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় ৯০ মিটার সেতুর পাশাপাশি দুই পাশে মোট ২৮৫ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কথা ছিল। ২০২৪ সালের জুনে সেতুর নির্মাণ শেষ হয়। এরপর পূর্ব পাশে ১৮০ মিটার সংযোগ সড়ক তৈরি করা হলেও পশ্চিম পাশের ১০৫ মিটার অংশের কাজ আটকে যায়।

জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় আটকে সংযোগ সড়ক

এলজিইডি কর্মকর্তারা জানান, সেতুর নকশা ও সমীক্ষার সময়ই দুই প্রান্তে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকার বিষয়টি জানা ছিল। সেখানে প্রায় দুই একর জমি প্রয়োজন হলেও জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা না করেই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়।

সেতুর কাজ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় পূর্ব পাশের জমির বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হয়। ফলে ওই অংশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পশ্চিম পাশের জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি দিতে রাজি হননি।

জমির মালিকদের দাবি, শুধু জমির মূল্য নয়, সংযোগ সড়ক নির্মাণের কারণে যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেগুলোরও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু মূল প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ না থাকায় পশ্চিম পাশের সংযোগ সড়কের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পরিস্থিতি সমাধানে গত বছরের নভেম্বরে নড়িয়া উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় থেকে ৮১ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হয়। তবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় এখনো সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

সেতু আছে, কিন্তু ওঠার পথ নেই

সেতু নির্মাণের পর থিরপাড়া ঘাটে আগের নৌকা পারাপারও বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। বর্তমানে সেই সাঁকো দিয়েই মানুষ সেতুর ওপর উঠছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাঁকোটি সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিদিন চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও অসুস্থ ব্যক্তিদেরও ঝুঁকি নিয়ে এটি পার হতে হচ্ছে।

ভেদরগঞ্জের চরভাগা এবং নড়িয়ার ঘড়িসার ইউনিয়নের বাসিন্দারা এই পথ দিয়ে ঘড়িসার বাজার, কার্তিকপুর, গোলার বাজার ও নড়িয়া উপজেলা সদরে যাতায়াত করেন। আশপাশের দুটি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত এই সাঁকো ব্যবহার করে।

প্রতিদিন হাজারো মানুষের দুর্ভোগ

চরভাগা এলাকার বাসিন্দা সাগর সরদার বলেন, প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এই পথে চলাচল করেন। আগে নৌকায় নদী পার হতে হতো। সেতু নির্মাণের পর মানুষের আশা ছিল যাতায়াত সহজ হবে। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই সুবিধা মিলছে না।

তিনি জানান, গত এক বছরে বাঁশের সাঁকো থেকে পড়ে কয়েকজন নারী ও শিশু আহত হয়েছেন।

ক্ষতিপূরণ চান জমির মালিক

থিরপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী শাহ আলম মাল জানান, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি ঘাট এলাকায় দোকান পরিচালনা করছেন। সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে হলে তাঁর দোকানও সরিয়ে নিতে হবে।

তাঁর ভাষ্য, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে দোকান সরিয়ে দিলে তিনি জীবিকা হারাবেন। তবে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার স্বার্থে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হলে জমি ও স্থাপনা ছাড়তে তাঁর আপত্তি নেই।

দ্রুত সমাধানের চেষ্টা

নড়িয়া উপজেলা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এক পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি দিতে রাজি না হওয়ায় কাজটি আটকে আছে।

শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, সেতু নির্মাণের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জমির মালিকেরা মৌখিকভাবে জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই ভিত্তিতেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে এক পাশের জমির সমস্যা সমাধান হলেও অন্য পাশের জমি পাওয়া যায়নি।

তিনি জানান, স্থাপনার আংশিক ক্ষতিপূরণসহ বিকল্প কোনো উপায়ে সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে সেতুটিকে পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।

দীর্ঘদিন পর সেতু নির্মাণ হলেও সংযোগ সড়কের অভাবে সেটি কার্যত অচল থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের দাবি, জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের জটিলতা দ্রুত সমাধান করে সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক।