The National Press ​
সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড নিদারাবাদের সাত খুন

Friday, October 16, 2026 The National Press
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড নিদারাবাদের সাত খুন


ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: সময় গড়িয়েছে প্রায় চার দশক। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামের একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আজও মুছে যায়নি স্থানীয় মানুষের মন থেকে। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে শশাঙ্ক দেবনাথকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এর দুই বছর পর খুন হন তাঁর স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ ও পাঁচ সন্তান। ছয়জনের মরদেহ টুকরো করে দুটি লোহার ড্রামে ভরে ধুপাজুড়ি বিলে ডুবিয়ে রাখার ঘটনা সে সময় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে পরিবারের কর্তা শশাঙ্ক দেবনাথের মরদেহ আজও উদ্ধার হয়নি।

১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবর শশাঙ্ক দেবনাথ নিখোঁজ হন। পরে তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমে উঠে আসে, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এর প্রায় দুই বছর পর, ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। তৎকালীন নাসিরনগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ গ্রামে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড বর্তমানে বিজয়নগর উপজেলার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অপরাধ হিসেবে পরিচিত।

জমি নিয়ে বিরোধ থেকেই হত্যার সূত্রপাত

নিদারাবাদ গ্রামের বাসিন্দা শশাঙ্ক দেবনাথের জমি ও বাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। অভিযুক্ত তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন দাবি করেছিলেন, শশাঙ্ক তাঁদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি করে ভারতে চলে গেছেন। অন্যদিকে, শশাঙ্কের পরিবারের পক্ষ থেকে জমি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।

শশাঙ্ক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ স্বামীর সন্ধান এবং সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে থানায় মামলা করেন। অভিযোগ ছিল, মামলা চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময় হুমকির মুখে পড়তে হয়।

মামলার বর্ণনা ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, শশাঙ্ককে হত্যার ঘটনায় তাজুল ইসলামকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জের ধরেই পরবর্তী সময়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

সীমান্তে নেওয়ার কথা বলে শশাঙ্ককে হত্যা

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাজুল ইসলাম শশাঙ্ককে হত্যার পরিকল্পনা ও ঘটনার বিবরণ দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন ভোরে তিনি ও তাঁর জামাতা ইনু মিয়া শশাঙ্কের বাড়িতে যান। তাঁকে জানানো হয়, তাঁর মেয়ের জামাই মনা দেবনাথ ভারত সীমান্তে অপেক্ষা করছেন। এ কথা বিশ্বাস করে শশাঙ্ক তাঁদের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হন।

পরে তাঁকে মাধবপুরের নিজনগর গ্রামের একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সীমান্ত পরিস্থিতির কথা বলে রাতে যাত্রার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাতেই তাজুল ও তাঁর সহযোগীরা গামছা দিয়ে শশাঙ্কের গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। পরে তাঁর মরদেহ ভারতের চেহরিয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত শরণার্থীশিবিরের পাতকুয়ায় ফেলে আসা হয় বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

তবে শশাঙ্কের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

একই পরিবারের ছয়জনকে হত্যার পরিকল্পনা

শশাঙ্ক নিখোঁজ হওয়ার পরও তাঁর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলতে থাকে। বিরজাবালা মামলা চালিয়ে যাওয়ায় তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলার বিবরণে উঠে আসে।

১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে বিরজাবালা দেবনাথ ও তাঁর পাঁচ সন্তানকে হত্যা করা হয়। নিহত সন্তানদের মধ্যে ছিলেন নিয়তিবালা দেবনাথ (১৭), সুভাস দেবনাথ (১৪), প্রণতিবালা দেবনাথ (১০), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন (৫) এবং সুজন দেবনাথ (২)।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে তাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা পরিকল্পনা করেন। এ কাজে অর্থের লেনদেন, নৌকা ভাড়া এবং হত্যার পর মরদেহ গোপন করার প্রস্তুতির কথাও জবানবন্দিতে উঠে আসে।

বর্ণনা অনুযায়ী, সহযোগীরা নৌকায় করে শশাঙ্কের বাড়িতে পৌঁছে ঘরে প্রবেশ করেন। পরে বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ধুপাজুড়ি বিলে।

সেখানে তাঁদের হত্যা করার পর মরদেহগুলো টুকরো করে দুটি লোহার ড্রামে রাখা হয়। ড্রামে চুন ও লবণ দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে সেগুলো বিলের পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

বিলের পানিতে ভেসে ওঠে দুর্গন্ধ, প্রকাশ পায় হত্যার ঘটনা

বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর ধুপাজুড়ি বিল থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আবুল মোবারক নৌকায় করে বাড়ি ফেরার পথে পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি নৌকা ঘুরিয়ে ওই স্থানে খোঁজ নেন।

একপর্যায়ে নৌকার নিচে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগলে মাঝি পানির নিচ থেকে একটি লোহার ড্রাম তুলে আনেন। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ড্রামটির মুখ খোলা হলে ভেতরে তিনটি মরদেহ পাওয়া যায়।

এরপর বিলের পানিতে তল্লাশি চালিয়ে দ্বিতীয় ড্রামটিও উদ্ধার করা হয়। সেটির ভেতরেও তিনটি মরদেহ ছিল। পরে সেগুলো নিখোঁজ বিরজাবালা ও তাঁর পাঁচ সন্তানের বলে শনাক্ত করা হয়।

শশাঙ্কের একমাত্র মেয়ে সুনীতিবালা দেবনাথ সে সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

বিচারে নয়জনের মৃত্যুদণ্ড

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং পরিকল্পিত হত্যার বিষয়টি সামনে আসে। মামলার বিচারিক কার্যক্রমে নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে তাজুল ইসলাম ও বাদশার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজন খালাস পান বলে প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাজুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল বলে জানান এলাকাবাসী। তাঁর মরদেহ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়িতে মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।

দুর্গম পথ পেরিয়ে সংবাদ সংগ্রহ

হত্যাকাণ্ডের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিলেন সাংবাদিকেরা। তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত সাংবাদিক এবং বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোহাম্মদ আরজু, সৈয়দ মোহাম্মদ আকরাম ও দীপক চৌধুরী বাপ্পির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই সময়ের চিত্র।

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা শহর থেকে নিদারাবাদে পৌঁছানো ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। কখনো রিকশায়, কখনো পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হতো। সংবাদ সংগ্রহের পর তা ঢাকার সংবাদপত্রের কার্যালয়ে পাঠাতেও বর্তমান সময়ের মতো তাৎক্ষণিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। টেলিগ্রাম কিংবা বাহকের মাধ্যমে সংবাদ পাঠানো হতো।

সাংবাদিকদের স্মৃতিতে, সে সময় গ্রামজুড়ে মানুষের মধ্যে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল।

চলচ্চিত্রেও উঠে আসে নিদারাবাদের ঘটনা

নিদারাবাদের সাত খুনের ঘটনা তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

ঘটনার প্রায় চার দশক পরও নিদারাবাদের মানুষের কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো অপরাধের ঘটনা নয়; বরং জমি নিয়ে বিরোধ, একটি পরিবারের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে উত্তর না পাওয়া নানা প্রশ্নের স্মারক।

স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হলেও শশাঙ্ক দেবনাথের দেহাবশেষের সন্ধান আজও মেলেনি। সেই অসমাপ্ত অধ্যায়ই নিদারাবাদের সাত খুনের ইতিহাসকে এখনো বেদনাবিধুর করে রেখেছে।