যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে সারাদেশে পালিত হচ্ছে মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বাধীনতা। বিজয়ের এই গৌরবময় দিনে জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ও দৃঢ় ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করতে পলাতক ও পরাজিত শক্তি সহিংসতা, গুপ্ত হামলা ও ভয় সৃষ্টির কৌশল বেছে নিয়েছে, তবে সরকার এসব অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করবে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এই ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বিভিন্ন গণমাধ্যমে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে ড. ইউনুস মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং বিজয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনের এক অম্লান গৌরবের দিন। লাখো শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি আদর্শ ন্যায়, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের আদর্শ।
ড. ইউনুস বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে। সেই চেতনাকে সামনে রেখেই বর্তমান সরকার দেশকে একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নির্বাচনের আগেই ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পালিয়ে যাওয়া পরাজিত শক্তিগুলো। তারা বুঝে গেছে তরুণরা, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক জাগরণই তাদের সবচেয়ে বড় বাধা। তাই তারা সহিংসতা, চোরাগুপ্তা হামলা ও ভয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।
তিনি বলেন, এসব শক্তি নির্বাচনের আগেই নিজেদের রাজত্ব কায়েম করার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু জনগণের ঐক্য ও রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের সামনে তাদের এই অপচেষ্টা সফল হবে না।
ভাষণে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ্য সংগঠক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, শরীফ ওসমান হাদীর ওপর হামলা কোনো এক ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর সরাসরি আঘাত।
ড. ইউনুস জানান, শরীফ ওসমান হাদী বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পলাতক শক্তিগুলো যতদিন তরুণদের পাশে জনগণকে পাবে, ততদিন তারা সফল হবে না। তরুণরাই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই তাদের দমন করতেই এই সহিংসতা।
তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ আমাদের সবাইকে জোর গলায় বলতে হবে আমরা তরুণদের রক্ষা করব। পুরোনো দাসত্বের রাজনীতিতে যারা বন্দি, তাদের সেই দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ভাষণে ড. ইউনুস বলেন, দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা। তিনি জানান, নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই।
তিনি বলেন, নির্বাচন অবধি বাকি মাত্র দুই মাস। এই সময়ে আমরা প্রতিটি দিন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ রাখতে চাই। জনগণই হবে এই নির্বাচনের প্রকৃত মালিক।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন সম্পন্ন হলে সহিংসতার পেছনে থাকা শক্তিগুলো জনগণের সমর্থন হারিয়ে বেকায়দায় পড়বে আর এ কারণেই তারা এত তাড়াহুড়ো করছে।
ড. ইউনুস বলেন, সরকার নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি দিন সতর্ক নজরদারিতে রাখবে।
আমরা তাদের প্রতিটি অপচেষ্টা নজরে রাখছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত। দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে কাউকে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়েই দেশের উপর জনগণের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব।
তিনি বিজয় দিবসে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান,বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষায় এগিয়ে আসার।
মহান বিজয় দিবসে প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণ নতুন করে জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিল, স্বাধীনতা শুধু অর্জনের নয়, রক্ষারও নাম, আর সেই দায়িত্ব আজ বর্তমান প্রজন্মের কাঁধেই ন্যস্ত।
সূত্র : বিডি প্রতিদিন
No comments:
Post a Comment