ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও তরুণ রাজনৈতিক উদীয়মান নক্ষত্র শরিফ উসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাধারণ কোনো রাজনৈতিক শত্রুতা নাকি এর পেছনে কাজ করছে কোনো বিশাল আর্থিক সিন্ডিকেট, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।
হাদিকে গুলি করা মূল শুটার ফয়সালের বোনের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ২১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকার রহস্যময় ১১টি ব্যাংকের চেক এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বিপুল অংকের এই লেনদেনের পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ। ব্যাংকগুলোতে নেই পর্যাপ্ত ব্যালেন্স, আবার ঠিকানায় নেই কোনো অফিস। এই ফ্যান্টম চেকের পেছনে আসলে কার হাত? হাদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কি কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় শক্তিশালী চক্র বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছিল?
ঘটনার সূত্রপাত হয় রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায়। শুটার ফয়সালের বোনের বাসার পাশের একটি ভবনের
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হাদিকে হত্যার ঠিক পরদিন ফয়সাল ও তার মা বাসার নিচে পরিত্যক্ত একটি স্থানে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিছু একটা খুঁজছেন।
পরবর্তীতে র্যাবের অভিযানে সেই স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু গুলি, যার সাথে হাদি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুলির হুবহু মিল পাওয়া যায়। কিন্তু গোয়েন্দাদের চোখ কপালে ওঠে যখন তারা ফয়সালের বোনের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালান। সেখান থেকে উদ্ধার হয় ১১টি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের মোট ৩৮টি চেক। এর মধ্যে ৩২টি চেকই ছিল নগদ অর্থ উত্তোলনের যোগ্য, যার সম্মিলিত মূল্যমান ২১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। একজন পেশাদার শুটারের বোনের বাসায় কেন এতো বিশাল অংকের চেক থাকবে, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি।
তদন্তকারী দল ও সংবাদকর্মীরা যখন এই চেকগুলোর সূত্র ধরে প্রিমিয়ার, আল আরাফাহ, প্রাইম, ন্যাশনাল ও ঢাকা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় পৌঁছান, তখন বেরিয়ে আসে আরও নাটকীয় তথ্য।
প্রিমিয়ার ব্যাংক ও গুলশানের রহস্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৩৫ কোটি টাকার ১০টি চেক ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকের ব্যবস্থাপক এই চেকের কথা শুনে রীতিমতো আঁতকে ওঠেন। তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি, যা এই লেনদেনের স্পর্শকাতরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রাইম ব্যাংকের ৯০ কোটি টাকার বড় অংকের চেকটি ছিল প্রাইম ব্যাংক গুলশান শাখার, যার পরিমাণ প্রায় ৯০ কোটি ৭ লাখ টাকা। শাখা ব্যবস্থাপক সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ন্যাশনাল ব্যাংকের অচল হিসাবের তদন্তে দেখা গেছে, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ইস্যু করা হয়েছিল ৫০ কোটি টাকার চেক। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ম্যাম ইমপেক্স নামের যে প্রতিষ্ঠানটি এই চেক দিয়েছে, তাদের হিসাবটি দীর্ঘদিন ধরে ডরম্যান্ট বা অচল এবং সেখানে কোনো টাকা নেই। আল আরাফাহ ও অগ্রণী ব্যাংকের নীরবতার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। কোটি কোটি টাকার চেক ইস্যু হলেও একাউন্টে ন্যূনতম ব্যালেন্স নেই।
তদন্তে দেখা গেছে, মোট ১৭২ কোটি টাকা এসেছে ৭টি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। এই তালিকায় রয়েছে রেনা শাহ ইন্টারন্যাশনাল, আবু ওমর ট্রেডিং করপোরেশন, ম্যাম ইমপেক্স, ড্রিমস ইনফিনিটি, চিশতি টেক্স, এম আর ইন্টারন্যাশনাল এবং আরও কিছু নাম।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ড্রিমস ইনফিনিটি নামক যে প্রতিষ্ঠানটি ৯০ কোটি টাকা দিয়েছে, তাদের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে বারিধারা ডিওএইচএস এ। সেখানে গিয়ে জানা যায়, এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান সেখানে কোনোদিন ছিলই না। ম্যাম ইমপেক্স এর বনানীর ঠিকানায় এই প্রতিষ্ঠানের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি, অথচ তারা ৫০ কোটি টাকার চেক ইস্যু করেছে। চিশতি টেক্স এর ইন্দিরা রোডের ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, তারা প্রায় ৪ বছর আগেই ব্যবসা গুটিয়ে পালিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে আরও ৬ ব্যক্তি মিলে ৪৬ কোটি টাকার চেক দিয়েছেন ফয়সালকে, যাদের পরিচয় এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
ওসমান হাদি কেবল একজন এক্টিভিস্ট ছিলেন না, তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর পল্টনে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে গুলি করা হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ মনে করছে, হাদি এমন কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্বার্থে আঘাত করেছিলেন, যার ফলে তাকে সরিয়ে দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই ২১৮ কোটি টাকার চেকগুলো কি কেবল একটি টোপ ছিল? নাকি এর মাধ্যমে বিশাল কোনো মানিলন্ডারিং বা বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল?
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের বা সিআইডির প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ জানিয়েছেন, এটি সাধারণ কোনো খুনের মামলা নয়। তিনি বলেন, এত বিশাল অংকের চেক পাওয়ার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। প্রতিটি চেকের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের আয়ের উৎস খুঁজে বের করা হবে। এর পেছনে কোনো বড় কর্পোরেট গ্রুপ বা রাজনৈতিক অপশক্তি জড়িত কিনা, তা নিশ্চিত হতে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। তিনি আরও জানান, চেকগুলো কেন ইস্যু করা হয়েছিল এবং এগুলোর মাধ্যমে কার কাছে টাকা পৌঁছানোর কথা ছিল, তা বের করতে পারলে হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ডদের ধরা সম্ভব হবে।
শাহবাগে এখনো হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলন চলছে। সাধারণ মানুষ ও ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা দাবি করছেন, শুটার ফয়সাল কেবল একজন ভাড়াটে খুনি। কিন্তু তাকে যারা ২১৮ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নামিয়েছিল, তারা কারা? অচল ব্যাংক একাউন্টের চেক দিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল নাকি এটি কোনো বড় অর্থনৈতিক জালিয়াতির অংশ, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে একজন জনপ্রিয় তরুণ নেতাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া এবং তার সাথে এতো বিপুল অর্থের যোগসূত্র পাওয়া যাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অশনি সংকেত।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এখন কেবল একটি খুনের মামলায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি রূপ নিয়েছে একটি বিশাল রহস্যময় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে। ২১৯ কোটি টাকার এই চেকগুলো কি হাদি হত্যার পুরস্কার ছিল? নাকি ফয়সালকে দিয়ে অন্য কোনো বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল?
ব্যাংকগুলোর নীরবতা এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের পেছনে যে গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে, তা উন্মোচন করাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলার মানুষ তাকিয়ে আছে সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে। ওসমান হাদির রক্ত আর এই রহস্যময় কোটি কোটি টাকার চেক, সবকিছুর সমাধান কি মিলবে? উত্তর দেবে সময়।
সূত্র : আমার সংবাদ
No comments:
Post a Comment