সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির লাশ গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় এসেছে। আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই মহানায়কের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের এই বিপ্লবীর মৃত্যুতে আজ সারা দেশে পালিত হবে রাষ্ট্রীয় শোক।
গতকাল বিকাল ৫টা ৪৮ মিনিটে হাদির লাশ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট (বিজে-৫৮৫) সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় হাদির লাশের সঙ্গে সিঙ্গাপুর থেকে আসেন তাঁর বড় ভাই আবু বকর। বিমানবন্দরে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হাদির কফিন বুঝে নিতে উপস্থিত ছিলেন সরকারের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং রাজপথের অগণিত সতীর্থ। এ সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও আত্মীয়স্বজনরা। একই সঙ্গে হাদির বোনজামাই আমিরুল ইসলাম এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন হাদির কফিনের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেট দিয়ে বের হওয়ার কথা থাকায় জুলাই যোদ্ধারা সেখানে অপেক্ষা করেন। পরে হাদির লাশ ক্যান্টনমেন্ট দিয়ে চলে যাওয়ায় জুলাই যোদ্ধারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। পুরো বিমানবন্দর এলাকা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত ছিল। বিমানবন্দরে ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
শরিফ ওসমান হাদির লাশ সন্ধ্যা ৬টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিমঘরে নেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বার্তায় বলা হয়, শহীদ ওসমান হাদির নামাজে জানাজা আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। অংশগ্রহণে আগ্রহীদের ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করতে বলা হয়েছে। সংসদ ভবন ও আশপাশ এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয় নগরে গণ সংযোগে অংশ নিতে গেলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর সোমবার উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চব্বিশের এই মহানায়ক। তাঁর এ শাহাদাতবরণের খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই খুনিদের বিচার দাবিতে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। গতকাল বাদ জুমা দেশের সব মসজিদ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে ওসমান হাদির রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা হয়। আজ হাদির জন্য রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। আজ জানাজা শেষে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
যেভাবে রাজপথের বিপ্লবী হয়ে ওঠেন ওসমান হাদি : ঢাকা-৮ আসনের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তা হলো শরিফ ওসমান হাদি। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে সব সময় ছিলেন প্রতিবাদমুখর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, বক্তা এবং জুলাই গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। স্বল্পসময়ের মধ্যেই তিনি রাজপথ, ক্যাম্পাস ও সমাজ মাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থান ছিল ওসমান হাদির রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। ওই সময় তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ঢাকার রামপুরায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তরুণদের সংগঠিত করা, মিছিল-সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি দ্রুত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এর পরই ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে ওসমান হাদির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সব ধরনের আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিকে এ প্ল্যাটফর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। ওসমান হাদি বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলন ও সভায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে পুরোনো ধারার রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। এ ছাড়া চলতি বছর আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ওসমান হাদি ছিলেন অন্যতম আলোচিত তরুণ নেতা। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তেই ওসমান হাদির দাফন, অংশ নিতে ঢাকায় পরিবার :
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি জীবদ্দশায় বিভিন্ন লেখালেখিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন মৃত্যুর পর যেন তাঁকে বাবা আবদুল হাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়। তবে তাঁর পরিবার জানিয়েছে, এ বিষয়ে রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাঁরা সেটিই সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নেবে।
বর্তমানে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ওসমান বিন হাদিকে দাফন করা হবে। দাফনে অংশ নিতে ওসমান হাদির গ্রামে থাকা ছোট বোন মাসুমা আক্তার ও বড় বোনের স্বামী আমির হোসেন গতকাল দুপুর ২টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে ঝালকাঠির নলছিটি ত্যাগ করেন।
গতকাল সকালে নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকায় ওসমান হাদির গ্রামের বাড়িতে সাংবাদিকদের আমির হোসেন বলেন, ওসমান হাদি এখন শুধু আমাদের পরিবারের নয়; তিনি রাষ্ট্রের সম্পদ। রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেটিই গ্রহণ করব। আমাদের একটাই চাওয়া ওসমান হাদির স্মৃতি যেন মুছে না যায়, দেশের প্রতি তাঁর আত্মত্যাগের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক।
ওসমান হাদির পৈতৃক বাড়ি নলছিটি উপজেলার হাঁড়িখালী গ্রামে। সেখানেই তাঁর বাবা আবদুল হাদি সমাহিত আছেন। ১৯৯৩ সালে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শরিফ ওসমান হাদি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন মাদরাসা শিক্ষক। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ওসমান হাদি সবার ছোট। এদিকে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে ঝালকাঠির নলছিটি। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন স্বজন, অনুসারী, সহযোদ্ধা, বন্ধু ও পাড়া প্রতিবেশীরা। কান্না ও বিস্ময়ে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্মৃতিচারণে উঠে আসে তাঁর দৃঢ় মনোবল, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস না করার দৃশ্যপট।
পরিবার ও স্বজনদের দাবি একটাই হাদিকে যারা হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
সূত্র : বিডি প্রতিদিন
No comments:
Post a Comment