একটি মহাকাব্যের শেষ পাতাটি আজ পঠিত হলো। যে বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় রক্তাক্ষরে লেখা ছিল সংগ্রাম, অবর্ণনীয় ত্যাগ আর এক হিমালয়সম আপসহীনতার গল্প, আজ তার শেষ লাইনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে মহাকাল। বিধাতা যেন এক অমোঘ নিয়তি আগে থেকেই লিখে রেখেছিলেন তার ললাটে।
তিনি বলতেন, বিদেশে আমার কেউ নেই, এদেশেই আমার জন্ম, এদেশেই আমি মরব। আজ সেই ধ্রুব সত্যটিই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে যে ধ্রুবতারাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতে পথহারা জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত, সেই আলো দিগন্তে বিলীন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। আজ বুধবার দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তার প্রিয়তম স্বামী, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে। এই বিচ্ছেদ শুধু একটি প্রাণের প্রস্থান নয়, বরং একটি সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় যুগের অবসান।
এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে জাতির কাণ্ডারি : ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেয়া এক শান্ত প্রকৃতির কিশোরী একদিন হয়ে উঠবেন একটি ভূখণ্ডের ভাগ্যবিধাতা, তা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেনি। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী গৃহবধূ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে দুই শিশু সন্তান নিয়ে যে অবর্ণনীয় কষ্ট তিনি সহ্য করেছিলেন, তা ছিল তার ধৈর্য ও সাহসের প্রথম পরীক্ষা।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক অভ্যুত্থানে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। চারদিকে তখন শকুনের ছায়া, দল ভাঙার ষড়যন্ত্র আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার। সেই দুঃসময়ে দলের সাধারণ কর্মীদের আর্তনাদে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দিয়ে শুরু করেন এক নতুন যুদ্ধ। এক হাতে বৈধব্য শোক, অন্য হাতে জাতীয় পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ব্যক্তি নয়, দল নয়, দেশ সবার আগে।
৯ বছরের রক্তঝরা সংগ্রাম ও আপসহীন নেত্রী : আশির দশকে তৎকালীন স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসা ছিল এক দুঃসাহসিক অভিযান। কিন্তু বেগম জিয়া ছিলেন অদম্য। সাত দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে তিনি তখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন। কতবার যে তাকে গৃহবন্দি হতে হয়েছে, কতবার তাকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তিনি কখনোই নতি স্বীকার করেননি। ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজপথের অঘোষিত সম্রাট।
১৯৯০ সালের সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব ছিল অবিসংবাদিত। স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দেশের মানুষ তাকে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ‘দেশনেত্রী’।
উন্নয়ন ও উৎপাদনের অগ্রপথিক : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল বাংলাদেশের স্বর্ণযুগ। তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন, যা এই দেশের নারীদের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’, ‘দারিদ্র্যবিমোচন’ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তার নেয়া প্রকল্পগুলো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল।
তিনি কেবল রাজনীতি করেননি, তিনি এই মাটির মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। যমুনা বহুমুখী সেতু থেকে শুরু করে অসংখ্য মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ও বাস্তবায়ন তার হাতেই হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো প্রচারের ডামাডোলে গা ভাসাননি, বরং নীরবে কাজ করে গেছেন।
জন্মভূমি ও মানুষের প্রতি আমৃত্যু টান : বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার দেশপ্রেম। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন তাকে দেশত্যাগের জন্য প্রবল চাপ দেয়া হচ্ছিল, যখন লোভনীয় প্রস্তাবের পাহাড় সাজানো হয়েছিল, তিনি তখন বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশের ধূলিকণাতেই আমার সব। বিদেশে থাকার চেয়ে এদেশের কারাগারে থাকা আমার কাছে অনেক বেশি গৌরবের।
আজ তার সেই কথাটিই নিষ্ঠুর সত্য হয়ে দেখা দিল। জরা-ব্যধি আর গত কয়েক বছরের অমানবিক কারান্তরীণ জীবনের অমানবিক কষ্টের মাঝেও তিনি এক ইঞ্চি সরে দাঁড়াননি বাংলার মাটি থেকে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে বারবার বিদেশ যাওয়ার আবেদন করা হলেও তিনি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো হীন শর্তে রাজি হননি।
তিনি জানতেন, তার অস্তিত্ব মিশে আছে এই দেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসায়। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি দেশের মানুষের অধিকার আর গণতন্ত্রের কথা বলে গেছেন। আজ যখন তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে সংসদ ভবনের সেই পরিচিত প্রাঙ্গণে, তখন আকাশের বাতাসও যেন ভারি হয়ে উঠবে তার বিয়োগ ব্যথায়।
ষড়যন্ত্রের শিকার ও কারান্তরীণ অন্ধকার জীবন : বিগত দেড় দশকে বেগম জিয়াকে যে পরিমাণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাকে দিনের পর দিন একা রাখা হয়েছে। সুচিকিৎসার অভাবে তার শরীর ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু ভাঙেনি তার মনোবল। মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে, তার বাসভবন থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি আঘাতেই তিনি আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন মানুষের হূদয়ে। তিনি জানতেন, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অবিনশ্বর।
রাষ্ট্রীয় সম্মান ও শোকাতুর বাংলাদেশ : দেশনেত্রীর এই মহাপ্রয়াণে আজ পুরো বাংলাদেশ স্তব্ধ। অন্তর্বর্তী সরকার আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ দল-মত নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ, খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের এক জীবন্ত পাহারাদার।
জাতীয় বায়তুল মোকাররমের খতিবের ইমামতিতে আজ যখন তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, তখন লাখো মানুষের চোখের অশ্রুসিক্ত করবে রাজধানীর রাজপথ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। এটি কেবল প্রটোকল নয়, এটি একটি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ-যিনি নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে।
শহীদ জিয়ার পাশে চিরনিদ্রায় : এক মহাকাব্যিক সমাপ্তি জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন শহীদ জিয়ার আদর্শের বিশ্বস্ত প্রহরী। আর মৃত্যুর পর তিনি ফিরে যাচ্ছেন তারই পাশে। ১৯৭৫ সালে মহান স্বাধীনতার ঘোষক যে স্বপ্ন নিয়ে এই রাষ্ট্রটি গড়েছিলেন, বেগম জিয়া সেই স্বপ্নকে লালন করেছেন গত ৪৪ বছর। যে মানুষটির হাত ধরে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, আজ সেই চিরচেনা শেরেবাংলা নগরের কবরের পাশেই রচিত হবে তার শেষ ঠিকানা। এটি যেন এক অলৌকিক মিলন। মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ কয়েক দশক, বয়ে গেছে কত রক্তচক্ষু আর ষড়যন্ত্রের স্রোত-কিন্তু বেগম জিয়া অবিচল ছিলেন নিজের অবস্থানে। দুই মহান আত্মা এক জায়গায় মিলিত হচ্ছেন।
গণতন্ত্রের মানসকন্যার শূন্যতা ও উত্তরসূরিদের প্রেরণা : বেগম খালেদা জিয়ার চলে যাওয়া মানে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হওয়া। রাজনীতিতে তার অভাব কেউ পূরণ করতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে। ন্যায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, তিনি তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তার জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু- ধৈর্য, সাহস, ক্ষমা এবং দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
তিনি বলতেন, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মিলেমিশে দেশ গড়তে হবে। তার এই উদারনৈতিক রাজনীতিই ছিল তার আসল শক্তি। আজ যখন দেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন তার অভাব প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভূত হচ্ছে। তিনি ছিলেন সেই মহীরুহ, যার ছায়াতলে এই দেশের মেহনতি মানুষ স্বস্তি পেতেন।
বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর থেকে যেন কান্নার শব্দ আসছে। মা হারিয়েছে তার প্রিয় সন্তানকে, কর্মীরা হারিয়েছে তাদের মাকে, আর জাতি হারিয়েছে তার সবচেয়ে সাহসী অভিভাবককে।
শোকের এই গভীর মুহূর্তে আমাদের সান্ত্বনা এটুকুই যে, তিনি মুক্তি পেয়েছেন সব পার্থিব কষ্ট থেকে। কারাগারের নির্জনতা আর দীর্ঘ অসুস্থতার যন্ত্রণা আজ আর তাকে স্পর্শ করবে না। তিনি এখন না-ফেরার দেশের যাত্রী।
জননী ও নেত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা : হে দেশনেত্রী, আপনি ঘুমান শান্তিতে। আপনার প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা আজ অর্ধনমিত আপনারই শোকে। আপনি যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে বাংলাদেশের মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না। আপনার বীরত্বগাথা প্রতিটি শিশুর পাঠ্য হওয়া উচিত, যাতে তারা শিখতে পারে কীভাবে নিজের দেশের মাটিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে হয়।
মহাকাব্যের শেষ পাতাটি হয়তো আজ বন্ধ হলো, কিন্তু এর প্রতিটি শব্দ আমাদের ধমনিতে রক্ত হয়ে বইবে। আপনার অভাব কোনোদিন পূর্ণ হবে না। বিদায়, হে মহাকালের শ্রেষ্ঠ নেত্রী। বিদায়, হে গণতন্ত্রের মানসকন্যা। আপনার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় আজ পুরো দেশ শোকাতুর হূদয়ে মোনাজাত করছে। আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘাসের ডগায়, প্রতিটি মানুষের নিঃশ্বাসে এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক
No comments:
Post a Comment