ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখসারির সংগঠক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই সম্পন্ন হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
রোববার রাজধানীর সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি অনুসন্ধান করছে।
ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় তদন্তে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং মূল অপরাধীদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতাদের চিহ্নিত করার জন্য এই মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে আমাদের কিছু বিষয় কৌশলগতভাবে গোপন রাখতে হচ্ছে, তবে সময় এলেই জড়িত সবাইকে প্রকাশ্যে আনা হবে। এই হত্যাকাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে সরকার মনে করছে। সে কারণেই পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
হাদি হত্যা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আশাবাদ প্রকাশ করে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হবে।
তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা তাড়াহুড়া করে নয়, বরং সঠিক ও টেকসই বিচার নিশ্চিত করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগপত্রে কেবল সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের নামই নয়, বরং যারা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন বা অর্থ ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি কঠোর বার্তাও দেন।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল না জেনেই ফ্যাসিস্ট শক্তির দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের নিজেদের দলে আশ্রয় দিচ্ছে, যা দেশের জন্য বিপজ্জনক। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের ভেতর লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী ও খোলস পাল্টানো দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করা। এরা সুযোগ পেলেই দেশ ও গণতন্ত্রের ক্ষতি করবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অভিযোগ করেন, হাদি হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
তার ভাষায়, ফ্যাসিস্টের দোসর ও সন্ত্রাসীরা অনবরত চেষ্টা করছে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে। আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি, যা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে তা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি সুবিচার হবে এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাম্প্রতিক কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণের ঘটনাও তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় একটি মাদ্রাসা ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও রাসায়নিক উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে ৫ থেকে ৬টি ককটেল, ১২ ড্রাম হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, আরও ৭ ড্রাম বিভিন্ন কেমিক্যাল, কয়েকটি বই এবং স্প্লিন্টার উদ্ধার করা হয়। এসব তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত নাশকতার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ মামলার মূল হোতা আলামিন এখনো পলাতক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত ছয়টি মামলা রয়েছে। তবে র্যাবের অভিযানে আলামিনের সহযোগী আহসান উল্লাহ ওরফে হাসানকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা শুধু ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরেই থামব না, বরং তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে চাই।
সবশেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিচার নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করবে না। তিনি আশ্বস্ত করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক সব সহিংস ও নাশকতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে যে, সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও বিচারবহির্ভূত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সূত্র : আমার সংবাদ
No comments:
Post a Comment